
গাজীপুরের ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজবাড়ী মাঠে দীর্ঘমেয়াদি মেলা আয়োজন বন্ধ করে মাঠটি খেলাধুলা ও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখার দাবি উঠেছে। এ দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকরা। পরে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সংলগ্ন রাজবাড়ী সড়কে ‘সচেতন নাগরিক ঐক্য’র উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ভাওয়াল রাজবাড়ী মাঠ গাজীপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জনজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অতীতে বৃক্ষমেলা কিংবা সরকারি কোনো আয়োজন হলেও তা মাঠের পশ্চিমাংশে সীমিত পরিসরে করা হতো। এতে মাঠের বড় অংশ শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা, শরীরচর্চা, সামাজিক অনুষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকত।
বক্তারা বলেন, রাজবাড়ী মাঠকে দীর্ঘ সময় মেলার অবকাঠামো দিয়ে দখল করে রাখা হলে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ নষ্ট হবে। একই সঙ্গে মাঠের মাটি ও ঘাস ক্ষতিগ্রস্ত, বর্জ্য ও পরিবেশদূষণ সৃষ্টি এবং অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে যানজট ও জনদুর্ভোগ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তারা আরও বলেন, গাজীপুরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জানাজা দীর্ঘদিন ধরে এ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ফলে জরুরি ও সামাজিক প্রয়োজনে মাঠটি ব্যবহারের সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি।
মানববন্ধনে মেলার নামে হাউজি, জুয়া ও লটারি বন্ধের দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, উন্নয়ন মেলা, বৃক্ষমেলা বা জনকল্যাণমূলক আয়োজন হতে পারে; কিন্তু কোনো আয়োজনের আড়ালে জুয়া কিংবা সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর কার্যক্রম গ্রহণযোগ্য নয়।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত রথ মেলার প্রসঙ্গ তুলে বক্তারা বলেন, ওই সময় গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও হাসপাতালের প্রধান সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় রোগী, স্বজন ও সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ভবিষ্যতে মেলার স্থান, পরিসর ও সময়সীমা নির্ধারণে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানান তারা।
মানববন্ধনে গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি আহমদ আলী রুশদির সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ড. শহিদুজ্জামান, জয়নাল আবেদীন, গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়নের সভাপতি প্রকৌশলী শামসুল হক, পেশাজীবী পরিষদ গাজীপুর জেলার সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, জয়দেবপুর বাজার ব্যবসায়ী কমিটির সভাপতি রায়হান আল মাহমুদ রানা, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট আলী নাছের খান, গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা মো. মাহফুজুর রহমান খান, ছাত্রশক্তির সংগঠক মো. নাবিল, পেশাজীবী নেতা তোফাজ্জল হোসেন, এনসিপি নেতা আলী আকবর এবং বাজার ব্যবসায়ী কমিটির মো. বাবুল হোসেনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।
কর্মসূচি শেষে নেতৃবৃন্দ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরুল করিম ভূঁইয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে ‘গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন’-এর পক্ষ থেকে তাঁর কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
স্মারকলিপিতে রাজবাড়ী মাঠে দীর্ঘমেয়াদি মেলা বন্ধ করে মাঠটি খেলাধুলার উপযোগী হিসেবে সংরক্ষণ এবং শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষসহ সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখার দাবি জানানো হয়।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, রাজবাড়ী মাঠের চারপাশে সরকারি বালক ও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি মহিলা কলেজ, কাজী আজিম উদ্দিন কলেজসহ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি মেলার কারণে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত এবং শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্মারকলিপি গ্রহণ করে জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া নাগরিকদের বক্তব্য ও দাবিগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তিনি রাজবাড়ী মাঠের ঐতিহাসিক ও সামাজিক গুরুত্ব বিবেচনায় নেওয়ার আশ্বাস দেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, “গাজীপুরের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, শিক্ষা, খেলাধুলা ও জনস্বার্থের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত প্রশাসন নেবে না। মাঠের ব্যবহার নিয়ে নাগরিকদের উদ্বেগ ও দাবিগুলো সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে জনস্বার্থ ও বাস্তবতা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “গাজীপুরের মানুষের কল্যাণ ও স্বার্থই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো আয়োজনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সুবিধা-অসুবিধা, শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ, শিক্ষার পরিবেশ এবং শহরের সামগ্রিক পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।”
নিজস্ব সংবাদ : 


















