
জমি আছে, বৈধ দলিল আছে, উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানাও আছে—তবু নিজের জমিতে ঘর তুলতে পারছেন না, নামজারি করতে পারছেন না, এমনকি বিক্রিও করতে পারছেন না গাজীপুরের হাজার হাজার মানুষ। বন বিভাগের গেজেটভুক্ত জমি সংক্রান্ত জটিলতায় জেলার ৮১৪টি মৌজা ও ১ হাজার ১৪৬টি গ্রামের বাসিন্দারা প্রায় দুই দশক ধরে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন।
২০০৬ সালের ২৩ মে থেকে শুরু হওয়া এ জটিলতায় ব্যক্তি মালিকানাধীন অসংখ্য জমি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই দাগে বন বিভাগের সামান্য জমি থাকলেই পুরো দাগের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে নামজারি, খাজনা, হস্তান্তর, স্থাপনা নির্মাণসহ সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে জমির মালিকরা এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিজেদের জমিতে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে গেলেই বন বিভাগের বাধার মুখে পড়তে হয়। কোথাও স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়, কোথাও মামলা করা হয়। এমনকি মৃত ব্যক্তিকেও মামলার আসামি করার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গাজীপুর সদরের ভবানীপুর মুক্তিযোদ্ধা কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এমদাদুল হক বলেন, “সব বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও আমরা জমির খাজনা-খারিজ করতে পারছি না। জমি বিক্রি করতে পারছি না, বাড়িঘরও তুলতে দিচ্ছে না। আমার প্রয়াত বাবাকেও মামলায় আসামি করা হয়েছে।”
তিনি জানান, শ্রীপুর মৌজার এসএ-১৭৬৬ নম্বর দাগে মোট ১৮২ বিঘা জমির মধ্যে বন বিভাগের অংশ মাত্র ৭ বিঘা। বন বিভাগ তাদের অংশ দখলে রেখেও বাকি জমির মালিকদের কোনো কাজ করতে দিচ্ছে না।
গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি এলাকার খোরশেদ আলম বলেন, “কেওয়া মৌজার ৫৪ বিঘা জমির মধ্যে বন বিভাগের জমি চার বিঘারও কম। অথচ পুরো জমিতে নিষেধাজ্ঞা। এতে মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে।”
জানা গেছে, ১৯২৭ সালের বন আইনের ২০ ধারার আওতায় গেজেটভুক্ত বনভূমির সঙ্গে একই দাগে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থাকায় এসব জমিতে নামজারি, হস্তান্তর ও খাজনা কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। ২০০৬ সালে এই আইন বলবৎ হয় ওই অঞ্চলে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, একই আইনের আওতায় বন বিভাগ নিজেদের অংশে নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করছে।
বিষয়টি গত মার্চ মাসে সংসদ অধিবেশনেও উঠেছে। গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম সংসদে বলেন, গাজীপুর সদর ও শ্রীপুরে সাধারণ মানুষ ও বন বিভাগের নামে রেকর্ডীয় জমি রয়েছে। বন বিভাগের স্টেটমেন্ট অনুযায়ী জমি বণ্টন করা হলে সাধারণ মানুষ হয়রানি থেকে মুক্তি পাবে।
জবাবে ভূমিমন্ত্রী জানান, ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় ১৯২৭-এর ২০ ধারার বিধানমতে সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে চূড়ান্ত ঘোষণা না করা পর্যন্ত ১৯২৭-এর ৪ ধারা মোতাবেক গেজেটভুক্ত বনভূমি হস্তান্তর, নামজারী, জমা-খারিজ, রেকর্ড সংশোধন ইত্যাদি কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। কিছু জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকায় কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। দাগভিত্তিক সীমানা নির্ধারণের কাজও চলছে।
পরিবেশবাদী মনির হোসেন বলেন, “২০০০ সালে গাজীপুরে বনভূমি ছিল ৩৯ হাজার ৯৪৩ হেক্টর। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ১৭৪ হেক্টরে। বনভূমি কমেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে।”
গাজীপুর জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, “এটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। সরকারের স্বার্থ যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। দ্রুত সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে।”
দীর্ঘ ২০ বছরের এই অচলাবস্থার অবসান চান গাজীপুরের লাখো মানুষ। তাদের দাবি—বন বিভাগের জমি আলাদা করে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে নামজারি, খাজনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম দ্রুত চালু করা হোক।
নিজস্ব সংবাদ : 










