গাজীপুর প্রতিনিধি: গাজীপুরের কাশিমপুর ভূমি অফিসের আওতাধীন গোবিন্দবাড়ি মৌজায় জমির পরিমাণ ও খাজনা-খারিজের হিসাব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ভূমির নথিপত্রে অসংগতি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিযোগকারী পক্ষ। তাদের দাবি, আরএস খতিয়ান ও দাগের তথ্য অনুযায়ী জমির পরিমাণ ১৭২ শতাংশ হলেও তিনটি জোত নম্বরে সর্বমোট ২৩৪ শতাংশ জমির খাজনা-খারিজ হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তের দাবি উঠেছে।
অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, গোবিন্দবাড়ি মৌজার আরএস খতিয়ান নম্বর ৫২৩, দাগ নম্বর ৪১৮-এর বিপরীতে জমির মোট পরিমাণ ১৭২ শতাংশ। অথচ সংশ্লিষ্ট তিনটি জোত নম্বরে খাজনা-খারিজের হিসাব নিম্নরূপ—
১. জোত নম্বর ২৪৯১৩ (২০২৩-২৪): ৪৪ শতাংশ।
২. জোত নম্বর ২৭৩৫৮ (২০২৪-২৫): ৭০ শতাংশ।
৩. জোত নম্বর ২৭৬৬৬ (২০২৪-২৫): ১২০ শতাংশ।
এই তিনটি হিসাব যোগ করলে মোট জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩৪ শতাংশ। অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, উল্লেখিত ১৭২ শতাংশের তুলনায় হিসাবটি ৬২ শতাংশ বেশি। ফলে অতিরিক্ত এই জমির খাজনা-খারিজ কোন দলিল, খতিয়ান, রেকর্ড কিংবা সরকারি আদেশের ভিত্তিতে করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
আরএস রেকর্ডে জমির পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, আরএস রেকর্ডে সংশ্লিষ্ট জমির পরিমাণ ৫৮ শতাংশ বলে উল্লেখ রয়েছে। অথচ ১২০ শতাংশ জমির খাজনা-খারিজ কীভাবে করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বাকি জমির উৎস কী, কোন মালিকানার ভিত্তিতে তা খাজনা-খারিজ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে জমির পরিমাণের এই পার্থক্য কেন—এসব বিষয়ের সুষ্ঠু ব্যাখ্যা চান তারা।
এ ক্ষেত্রে এসএ ও আরএস রেকর্ড, মূল খতিয়ান, দলিল, নামজারি মামলার আদেশ, ডিসিআর এবং ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ যাচাই করে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। রেকর্ডের ভুল, একাধিক খতিয়ানের জমি, অথবা অন্য কোনো বৈধ মালিকানার ভিত্তি রয়েছে কি না, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
তৎকালীন কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি
অভিযোগের সময় সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে তৎকালীন নায়েব হিসেবে আব্দুল লতিফ এবং সার্ভেয়ার/ভারপ্রাপ্ত কানুনগো হিসেবে রফিকুল ইসলাম দায়িত্বে ছিলেন বলে অভিযোগকারী পক্ষ জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সময়ে জমির পরিমাণ নির্ধারণ, নথি যাচাই এবং খাজনা-খারিজের প্রক্রিয়ায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তাঁদের বক্তব্য, দাপ্তরিক নথি এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের আদেশ যাচাই করা জরুরি।
ভূমি অফিসে দালালচক্রের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, কাশিমপুর ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষ জমিসংক্রান্ত সেবা নিতে গিয়ে নানা জটিলতা ও হয়রানির আশঙ্কায় থাকেন। তাঁদের অভিযোগ, ভূমি অফিসকে ঘিরে দালালচক্রের প্রভাব এবং অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন, তবুও জমির রেকর্ড ও খাজনা-খারিজের হিসাবের অসংগতি থাকলে তা দ্রুত তদন্ত করা জরুরি।
জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা
এলাকাবাসী ও অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন ভূমি কর্তৃপক্ষ যেন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন। গোবিন্দবাড়ি মৌজার আরএস খতিয়ান নম্বর ৫২৩ ও দাগ নম্বর ৪১৮-এর জমির মূল রেকর্ড, তিনটি জোত নম্বরের নথি এবং খাজনা-খারিজের আদেশ সরেজমিনে ও দাপ্তরিকভাবে যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক।
তদন্তে কোনো অনিয়ম, জালিয়াতি কিংবা সরকারি বিধিবিধান লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী পক্ষ। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ যেন হয়রানি ছাড়া বৈধ ভূমিসেবা পান, তা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
এখন প্রশ্ন—১৭২ শতাংশ জমির বিপরীতে ২৩৪ শতাংশের খাজনা-খারিজের হিসাব কীভাবে এলো? অতিরিক্ত ৬২ শতাংশ জমির ভিত্তি কোথায়? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে কি নিরপেক্ষ তদন্তে?