বিশেষ প্রতিনিধিঃ দীর্ঘ ১৭ বছরের জমে থাকা অনিয়ম, দুর্নীতি আর প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে মাত্র সাত মাসেই নতুন রূপ পেতে শুরু করেছিল গাজীপুর জেলা পরিষদ। বাজেট বাড়ার পাশাপাশি উদ্ধার হচ্ছিল একের পর এক অবৈধ দখলে থাকা সম্পত্তি। কিন্তু সংস্কারের সেই কাজের গতি যখন সবচেয়ে বেশি, ঠিক তখনই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোঃ নজরুল ইসলামকে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে। আর এই আদেশকে কেন্দ্র করে গাজীপুরের সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিইও নজরুল ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার পর জেলা পরিষদের বাজেট প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৫৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। এছাড়া আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি কমাতে পূর্বে বিভিন্ন দূর্বল ব্যাংকের ১৩টি শাখায় থাকা অর্থ উদ্ধার করে সোনালী ব্যাংকে ৬৫ কোটি এবং প্রাইম ব্যাংকে ৫০ কোটি- মোট ১১৫ কোটি টাকা এফডিআর (FDR) করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জেলা পরিষদের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে এটি দায়িত্বকালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
কেবল আর্থিক সংস্কারই নয়, দীর্ঘদিনের দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে ৫৩টি নোটিশের মাধ্যমে বহু বিঘা জমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। গাজীপুর জেলা পরিষদের নামে ২৫ শতাংশ জমি দানের ঐতিহাসিক উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয় তার মাধ্যমে। এই উদ্যোগকে জেলা পরিষদের ভবিষ্যৎ অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ ও সেবার পরিধি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নিজস্ব অডিটোরিয়াম ও ডাকবাংলো ব্যবস্থাপনায় আনায়ন করা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ টাকার রাজস্ব। বন্ধ থাকা শিক্ষাবৃত্তি প্রায় চার বছর পর ফের চালু করে ৩৫ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর হাতে সহায়তা তুলে দেওয়া এবং ক্রীড়া অঙ্গনে ১,২০০টি ফুটবল বিতরণ ছিল অন্যতম আলোচিত উদ্যোগ।
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই প্রশাসনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) চালু, নতুন অফিস রেজিস্টার সংযোজন, দাপ্তরিক নথিপত্র সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা আরোপ এবং অফিস কার্যক্রমকে আরও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ এবং তাদের বেতন ও কল্যাণমূলক সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়।
নাগরিক সেবাকে আরও সহজ ও জনবান্ধব করতে জেলা পরিষদের ওয়েবসাইট হালনাগাদ, সিটিজেন চার্টার চালু ও দীর্ঘদিনের শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ভাঙচুরে জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেখানে শিল্পসম্মতভাবে গাজীপুর জেলা ও বাংলাদেশের মানচিত্র স্থাপন করা হয়। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগে জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণের সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্গঠন, উন্নয়ন ও আত্মমর্যাদার প্রতীক হিসেবেও এটি প্রশংসা কুড়িয়েছে।
উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ভাওয়াল বিপণিবিতানের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ, কালিয়াকৈরে বহুতল ভবন নির্মাণ এবং সমগ্র জেলাকে ফ্রি ওয়াই-ফাইয়ের আওতায় আনার মতো পাঁচটি মেগা প্রকল্পসহ ১২০৮টি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল তার হাত ধরেই।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতা রাব্বি গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নজরুল ইসলাম একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা। তিনি জেলা পরিষদের প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্প নিজে সশরীরে তদারকি করতেন এবং কাজের মান নিশ্চিত করতেন। তার দূরদর্শী পরিকল্পনায় জেলা পরিষদ যখন আলোর মুখ দেখছিল, ঠিক তখনই তাকে সরিয়ে দেওয়া হলো। এতে গাজীপুরের সাধারণ মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করব, জনস্বার্থ বিবেচনা করে তাকে এখানেই পুনর্বহাল করা হোক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন অনিয়মের সুযোগ নেওয়া একটি সুবিধাভোগী চক্রান্তকারী মহল এই সংস্কার কার্যক্রমে বাধাগ্রস্ত হয়ে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তার করে তার বদলি নিশ্চিত করেছে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, সরকারি চাকরিতে বদলি স্বাভাবিক নিয়ম হলেও, যিনি অল্প সময়ে দক্ষতা ও সততার প্রমাণ দিলেন, তাকে সংস্কারের মাঝামাঝি সময়ে সরিয়ে দেওয়া জনস্বার্থের পরিপন্থী। গাজীপুরবাসীর এখন একটাই দাবি—ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও জেলা পরিষদের অর্জিত স্বচ্ছতা, আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সেবামুখী ধারা যেন কোনোভাবেই থমকে না যায়।